দিনে ৬০ কেজি সোনায় ঘুষ ১৫ লাখ টাকা !
রিপোর্টারঃ মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু ও সৈয়দ আতিক
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর, ২০১৪
মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তর্কে জড়ালেন দেশের সোনা চোরাচালানের মূল হোতা মাহমুদুল হক পলাশ ও বিমানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এমদাদ হোসেন। শনিবার সকালে এ দুজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময় গোয়েন্দা পুলিশের সামনেই একে অপরের দিকে তেড়ে যান। পলাশ সোনা চোরাচালানের পুরোটাই জানে, ডিজিএম এমদাদ গোয়েন্দা পুলিশকে এমন তথ্য দেয়ার পরপরই উত্তেজিত হয়ে পড়েন তিনি। এসময় পলাশ ডিজিএমকে লক্ষ্য করে গোয়েন্দাদের বলেন, তিনি যখন শর (টাকা) খেতেন তখন ভালো লাগত। এখন সব দোষ আমার। আপনারা সহায়তা না করলে বিমানবন্দর দিয়ে সুতাও বের করা সম্ভব নয়। এরই একপর্যায়ে তথ্যবোমা ফাটান মাহমুদুল হক পলাশ। তিনি বলেন, তিন জিএম দিনে ৬০ কেজি সোনা বিমানবন্দর থেকে বের করে দেয়ার জন্য তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। এজন্য তারা প্রতিদিন ৫ লাখ করে তিন জন ১৫ লাখ টাকা নিতেন। প্রায় টানা তিন বছর ধরে তারা একাজ করেছেন। দেশের সবচেয়ে বড় সোনা চোরাচালান মামলার তদন্তে জড়িত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এ তিন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হচ্ছেন মোমিনুল ইসলাম (সিকিউরিটি), আতিক সোবহান (এয়ারপোর্ট সার্ভিস ও সাবেক জিএম বিএফসিসি) এবং ডেপুটি চিফ অব (ট্রেনিং) শামীম নজরুল। বাংলাদেশে সোনা চোরাচালানের গডফাদার এমদাদুল হক পলাশের হয়ে বিমানবন্দরে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন পরিচালক (প্রশাসন) রাজপতি সরকার।
এদের মাধ্যমে প্রতিদিন ৬০ কেজি হিসাবে প্রতি মাসে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে পাচার হতো প্রায় দুই মেট্রিক টন (১৮০০ কেজি) সোনা। বছরের হিসাবে এ পাচারের পরিমাণ সাড়ে ২১ মেট্রিক টনের বেশি। চুক্তি অনুযায়ী প্রায় তিন বছর ধরে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে নিরাপদে সোনার চালানগুলো বের করে দিয়েছেন বিমানের তিন মহাব্যবস্থাপক। সে হিসাবে গত তিন বছর শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়েই এ চক্রের মাধ্যমে চোরাচালান হয়েছে প্রায় ৬৫ মেট্রিক টন সোনা। এজন্য তিন মহাব্যস্থাপক (জিএম) চোরাচালানিদের কাছ থেকে নিয়েছেন ১৬৫ কোটি টাকা। তবে এ টাকা ভাগ হয়েছে বিমান, সিভিল এভিয়েশন এবং নিরাপত্তার সঙ্গে নিয়োজিত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম যুগান্তরকে বলেন, যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই চলছে। আমাদের হাতে এখনও সময় আছে। যেহেতু এটি বড় মামলা তাই ভেবেচিন্তে ও সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালানো হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, দুবাই থেকে যেমন স্বর্ণ চোরাচালান হয়ে এদেশে আসে, তেমনই বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার হয়ে যায় দুবাইতে। একই প্রক্রিয়ায় এ ডলারগুলো বিমান ক্রুদের মাধ্যমে দুবাইতে পাঠানো হতো। আর এর নেপথ্যে রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১২ থেকে ১৫ জন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। এসব মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীরাও গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, পলাশের মোবাইলের কললিস্ট ও মেসেজ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের নাম পাওয়া গেছে। সোনা চোরাচালানে এরা সবাই পলাশের সহযোগী।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) কর্মীরা উচ্ছিষ্ট খাবারের মধ্যে এবং ক্লিনাররা টয়লেটের বর্জ্যরে ভেতর সোনা নিয়ে এয়ারক্রাফট থেকে নেমে আসে। এছাড়া ফ্লাইং ক্লাবের গেট ও রানওয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঘাস ও পুকুরের মধ্যে স্বর্ণের চালান লুকিয়ে রাখা হতো। রাতে সিভিল এভিয়েশনের পাশধারী কর্মীরা তা বাইরে পাচার করত। প্রকৌশল শাখার কর্মীরা উড়োজাহাজের বিভিন্ন পার্টস ও টয়লেটের ভেতরে গোপন স্থানে নাট-বল্টু খুলে সোনা রাখা ও বের করার ব্যবস্থা করছে। অন্যদিকে শিডিউল বিভাগ মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলোতে কে ডিউটি করবে তা নিয়ন্ত্রণ করত। সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশল বিভাগ, বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিং এবং পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিয়ন্ত্রণকারী এবং শিডিউল বিভাগই মূলত সোনা পাচারের ছক তৈরি করত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বিমান ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুপাইপার থেকে শুরু করে ট্রলিম্যান, পাইলট, কেবিন ক্রু, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাসহ শতাধিক ব্যক্তি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। ওই কর্মকর্তা বলেন, যে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে পুরো মাত্রায় গ্রেফতার অভিযান শুরু হলে ফ্লাইট শিডিউল ভেঙে পড়ার আশংকা রয়েছে। এ বিষয়টি ইতিমধ্যেই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরকে অবহিত করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাহমুদুল হক পলাশ গোয়েন্দাদের বলেন, তার সঙ্গে চুক্তির বাইরেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সোনা বিমানবন্দর দিয়ে পাচার হয়েছে। তার ভাষায়, এগুলো ছিল লোকাল। ছোটখাটো চুক্তিতে বাইরে বের করার সময় কিছু স্বর্ণ ধরা পড়েছে, যা একেবারেই হাতেগোনা। জিজ্ঞাসাবাদে পলাশ বলেছেন, পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা এমনকি কথিত সাংবাদিকদেরও তিনি নিয়মিত টাকা দিতেন। মাসিক এবং সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তার লোকজন এ টাকা পৌঁছে দিত।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চক্রটির সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের চোরাচালানিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাফিয়া হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মাহমুদুল হক পলাশ। দুবাইতে বসে বাংলাদেশে স্বর্ণ পাচার করছেন আব্বাস এবং শাহীন। পলাশের আপন দুই ভাই সেখান থেকে সোনা চোরাচালান মনিটর করেন। আর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সোনা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করেন জসিম নামে এক ব্যক্তি। এরা সবাই বাংলাদেশী বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, পলাশের মোবাইলের কললিস্ট ও মেসেজ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের নাম পাওয়া গেছে। সোনা চোরাচালানে এরা সবাই পলাশের সহযোগী। চালান বের হওয়ার আগেই পলাশের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করত। গোয়েন্দা পুলিশের কাছে এসব নামের তালিকা রয়েছে। এদের মধ্যে যশোর এলাকার একজন সংসদ সদস্য এবং একজন নেতার নামও রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, পলাশ একাধিক সিমকার্ড ব্যবহার করতেন। তার মোবাইলে থাকা ভাইবারেও আদান-প্রদান হতো এসএমএস। এর মধ্যে পলাশের স্ত্রী বিমানবালা নূরজাহানের সঙ্গেও চালান আসার বিষয়ে কথা হতো। বিশেষ করে বেশ কয়েকজন চোরাচালানির সঙ্গে তার স্ত্রীর সখ্য ছিল। সেই সূত্র ধরে পলাশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হয়। পলাশ স্বীকার করেছেন তিনি গডফাদার থেকে একেবারে মাঠপর্যায় সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
চলতি মাসে চোরাচালানি মিন্টু, নিজাম, হাসান, আবু মিয়া, রিয়াজের সঙ্গে দুই দফা চালান নিয়ে কয়েকটি এসএমএস দেয় পলাশ। এ মাসেই এহসান, সানা বাবু, রোমান, আব্বাস, হাসান, নাজির, রফিক, ফারুক, আবু সালেহ, মিয়া জাহাঙ্গীর, সুমন আলী, এমরান আলী, মকিদ মিয়া, আবদুস শহীদ ও মিরন আলীর সঙ্গে কথা হয়। এরা বিমানবন্দর থেকে সোনার চালান নিয়ে বাইরে বের হয়। আর তাদের নিরাপদে বের করতে পলাশ সব ধরনের সহায়তা করে।
অনিক মানি এক্সচেঞ্জের জাকির, ভাই-ভাই মানি এক্সচেঞ্জের টিপু, ঢাকা মানি এক্সচেঞ্জের আলী নেওয়াজ, প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের জাহাঙ্গীর মিয়া এবং জাকির মানি এক্সচেঞ্জের বাকাউল হক ও বাইতুল মিয়ার সঙ্গে পলাশের সম্পর্ক রয়েছে। তার মোবাইল ফোনে এদের সবার মোবাইল নম্বর আছে। তাদের সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ হতো পলাশের।
ভাই ভাই মানি এক্সচেঞ্জের হয়ে গোপনে কাজ করেন খোকন, পঙ্কজ, বাবু, ফরহাদ, উজ্জ্বল, শিব নামের কয়েকজন। আর জাকির মানি একচেঞ্জের হয়ে রাকিব, বিশ্বজিৎ, বিপ্লব কাজ করে।
মামুন, মাসুম, জয়, কালু মিয়া, রাসেল বজলু মিয়া, হক দুলু, কামাল হোসেন, মোবারক পলাশের পরিচিত। তারা সরাসরি বিমানবন্দর থেকে সোনার চালান নিয়ে সংসদ সদস্য লেখা একটি গাড়িতে চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকায় যেতেন। সেখান থেকে তারা সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় লোকদের হাতে সোনার চালান তুলে দিতেন।
সাতক্ষীরা সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশের এপারে আসতেন গওহর, লালু, গোবিন্দ, বিজন হালদার, লক্ষণ, গোপাল, রূপ সাহা। তাদের হাতে সোনার চালান তুলে দিতেন কামাল, দুলু এবং রাসেল। এই রাসেল হচ্ছে পলাশের স্ত্রীর নূরজাহানের ঘনিষ্ঠজন। একসময় রাসেল লাগেজপার্টির সদস্য ছিল। নিরাপদে সোনা গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজ নেয়। পলাশ নিয়মিত দুবাই যেতেন। তার স্ত্রী নূরজাহানের সঙ্গে দুবাইয়ের ইমরান মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী ইমরান আলী ও আসিফ হোসেনের পুরনো বন্ধুত্ব। সেই সূত্র ধরে তারা সেখানে যেতেন। পলাশ স্বীকার করেন সাবেক কাস্টম কর্মকর্তা ওয়াজেদ ও সিভিল এভিয়েশনের রেখা পারভীন. বিমানের কর্মকর্তা শাহজাহান সিরাজ, এমরান আলী, আবদুল মতিন, আনিসুল ইসলামও সোনার চোরাচালানে জড়িত।
পলাশের মোবাইলে পাওয়া গেছে স্ত্রী নূরজাহানের এসএমএস। যেখানে বলা হয়েছে, দুলু জিনিস নিয়ে বের হচ্ছে। তুমি সামলাও। এভাবে বিভিন্ন সময় অসংখ্য এসএমএস রয়েছে পলাশের মোবাইলে। পলাশ ক্যাপ্টেন শামীম নজরুলের মোবাইলেও এসএমএস দিতেন। পাওয়া গেছে এরকম তথ্য স্যার সব খালাস। তারপর অন্য আরও দুজন কর্মকর্তার মোবাইলে এসএমএস গেছে। সেখানে লেখা আছে, সব হাতে নিয়েছি। আসেন ভাগ করে চলে যাব। তবে এসব মেসেজ ভাইবারে প্রদান করত গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত পলাশ।
গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে পলাশ বলেছেন, আইনশৃংখলা বাহিনী, বিভিন্ন সংস্থা ও বিমানের বিভিন্ন পর্যায় ছাড়াও বিমানবন্দরে বিভিন্ন পেশা-শ্রেণীর লোকদের হাতে সপ্তাহে ২ লাখ টাকা পেমেন্ট দেয়া হতো। এর মধ্যে কথিত কিছু নামধারী সংবাদকর্মী প্রতি বৃহস্পতিবার ৫ হাজার টাকা করে নিতেন বলে তিনি গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন।
- সুত্রঃ #যুগান্তর
রিপোর্টারঃ মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু ও সৈয়দ আতিক
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর, ২০১৪
মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তর্কে জড়ালেন দেশের সোনা চোরাচালানের মূল হোতা মাহমুদুল হক পলাশ ও বিমানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এমদাদ হোসেন। শনিবার সকালে এ দুজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময় গোয়েন্দা পুলিশের সামনেই একে অপরের দিকে তেড়ে যান। পলাশ সোনা চোরাচালানের পুরোটাই জানে, ডিজিএম এমদাদ গোয়েন্দা পুলিশকে এমন তথ্য দেয়ার পরপরই উত্তেজিত হয়ে পড়েন তিনি। এসময় পলাশ ডিজিএমকে লক্ষ্য করে গোয়েন্দাদের বলেন, তিনি যখন শর (টাকা) খেতেন তখন ভালো লাগত। এখন সব দোষ আমার। আপনারা সহায়তা না করলে বিমানবন্দর দিয়ে সুতাও বের করা সম্ভব নয়। এরই একপর্যায়ে তথ্যবোমা ফাটান মাহমুদুল হক পলাশ। তিনি বলেন, তিন জিএম দিনে ৬০ কেজি সোনা বিমানবন্দর থেকে বের করে দেয়ার জন্য তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। এজন্য তারা প্রতিদিন ৫ লাখ করে তিন জন ১৫ লাখ টাকা নিতেন। প্রায় টানা তিন বছর ধরে তারা একাজ করেছেন। দেশের সবচেয়ে বড় সোনা চোরাচালান মামলার তদন্তে জড়িত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এ তিন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হচ্ছেন মোমিনুল ইসলাম (সিকিউরিটি), আতিক সোবহান (এয়ারপোর্ট সার্ভিস ও সাবেক জিএম বিএফসিসি) এবং ডেপুটি চিফ অব (ট্রেনিং) শামীম নজরুল। বাংলাদেশে সোনা চোরাচালানের গডফাদার এমদাদুল হক পলাশের হয়ে বিমানবন্দরে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন পরিচালক (প্রশাসন) রাজপতি সরকার।
এদের মাধ্যমে প্রতিদিন ৬০ কেজি হিসাবে প্রতি মাসে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে পাচার হতো প্রায় দুই মেট্রিক টন (১৮০০ কেজি) সোনা। বছরের হিসাবে এ পাচারের পরিমাণ সাড়ে ২১ মেট্রিক টনের বেশি। চুক্তি অনুযায়ী প্রায় তিন বছর ধরে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে নিরাপদে সোনার চালানগুলো বের করে দিয়েছেন বিমানের তিন মহাব্যবস্থাপক। সে হিসাবে গত তিন বছর শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়েই এ চক্রের মাধ্যমে চোরাচালান হয়েছে প্রায় ৬৫ মেট্রিক টন সোনা। এজন্য তিন মহাব্যস্থাপক (জিএম) চোরাচালানিদের কাছ থেকে নিয়েছেন ১৬৫ কোটি টাকা। তবে এ টাকা ভাগ হয়েছে বিমান, সিভিল এভিয়েশন এবং নিরাপত্তার সঙ্গে নিয়োজিত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম যুগান্তরকে বলেন, যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই চলছে। আমাদের হাতে এখনও সময় আছে। যেহেতু এটি বড় মামলা তাই ভেবেচিন্তে ও সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালানো হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, দুবাই থেকে যেমন স্বর্ণ চোরাচালান হয়ে এদেশে আসে, তেমনই বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার হয়ে যায় দুবাইতে। একই প্রক্রিয়ায় এ ডলারগুলো বিমান ক্রুদের মাধ্যমে দুবাইতে পাঠানো হতো। আর এর নেপথ্যে রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১২ থেকে ১৫ জন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী। এসব মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীরাও গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, পলাশের মোবাইলের কললিস্ট ও মেসেজ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের নাম পাওয়া গেছে। সোনা চোরাচালানে এরা সবাই পলাশের সহযোগী।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) কর্মীরা উচ্ছিষ্ট খাবারের মধ্যে এবং ক্লিনাররা টয়লেটের বর্জ্যরে ভেতর সোনা নিয়ে এয়ারক্রাফট থেকে নেমে আসে। এছাড়া ফ্লাইং ক্লাবের গেট ও রানওয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঘাস ও পুকুরের মধ্যে স্বর্ণের চালান লুকিয়ে রাখা হতো। রাতে সিভিল এভিয়েশনের পাশধারী কর্মীরা তা বাইরে পাচার করত। প্রকৌশল শাখার কর্মীরা উড়োজাহাজের বিভিন্ন পার্টস ও টয়লেটের ভেতরে গোপন স্থানে নাট-বল্টু খুলে সোনা রাখা ও বের করার ব্যবস্থা করছে। অন্যদিকে শিডিউল বিভাগ মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলোতে কে ডিউটি করবে তা নিয়ন্ত্রণ করত। সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশল বিভাগ, বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিং এবং পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিয়ন্ত্রণকারী এবং শিডিউল বিভাগই মূলত সোনা পাচারের ছক তৈরি করত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বিমান ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুপাইপার থেকে শুরু করে ট্রলিম্যান, পাইলট, কেবিন ক্রু, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাসহ শতাধিক ব্যক্তি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। ওই কর্মকর্তা বলেন, যে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে পুরো মাত্রায় গ্রেফতার অভিযান শুরু হলে ফ্লাইট শিডিউল ভেঙে পড়ার আশংকা রয়েছে। এ বিষয়টি ইতিমধ্যেই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরকে অবহিত করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাহমুদুল হক পলাশ গোয়েন্দাদের বলেন, তার সঙ্গে চুক্তির বাইরেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সোনা বিমানবন্দর দিয়ে পাচার হয়েছে। তার ভাষায়, এগুলো ছিল লোকাল। ছোটখাটো চুক্তিতে বাইরে বের করার সময় কিছু স্বর্ণ ধরা পড়েছে, যা একেবারেই হাতেগোনা। জিজ্ঞাসাবাদে পলাশ বলেছেন, পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা এমনকি কথিত সাংবাদিকদেরও তিনি নিয়মিত টাকা দিতেন। মাসিক এবং সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তার লোকজন এ টাকা পৌঁছে দিত।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চক্রটির সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের চোরাচালানিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাফিয়া হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মাহমুদুল হক পলাশ। দুবাইতে বসে বাংলাদেশে স্বর্ণ পাচার করছেন আব্বাস এবং শাহীন। পলাশের আপন দুই ভাই সেখান থেকে সোনা চোরাচালান মনিটর করেন। আর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সোনা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করেন জসিম নামে এক ব্যক্তি। এরা সবাই বাংলাদেশী বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, পলাশের মোবাইলের কললিস্ট ও মেসেজ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের নাম পাওয়া গেছে। সোনা চোরাচালানে এরা সবাই পলাশের সহযোগী। চালান বের হওয়ার আগেই পলাশের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করত। গোয়েন্দা পুলিশের কাছে এসব নামের তালিকা রয়েছে। এদের মধ্যে যশোর এলাকার একজন সংসদ সদস্য এবং একজন নেতার নামও রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, পলাশ একাধিক সিমকার্ড ব্যবহার করতেন। তার মোবাইলে থাকা ভাইবারেও আদান-প্রদান হতো এসএমএস। এর মধ্যে পলাশের স্ত্রী বিমানবালা নূরজাহানের সঙ্গেও চালান আসার বিষয়ে কথা হতো। বিশেষ করে বেশ কয়েকজন চোরাচালানির সঙ্গে তার স্ত্রীর সখ্য ছিল। সেই সূত্র ধরে পলাশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হয়। পলাশ স্বীকার করেছেন তিনি গডফাদার থেকে একেবারে মাঠপর্যায় সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
চলতি মাসে চোরাচালানি মিন্টু, নিজাম, হাসান, আবু মিয়া, রিয়াজের সঙ্গে দুই দফা চালান নিয়ে কয়েকটি এসএমএস দেয় পলাশ। এ মাসেই এহসান, সানা বাবু, রোমান, আব্বাস, হাসান, নাজির, রফিক, ফারুক, আবু সালেহ, মিয়া জাহাঙ্গীর, সুমন আলী, এমরান আলী, মকিদ মিয়া, আবদুস শহীদ ও মিরন আলীর সঙ্গে কথা হয়। এরা বিমানবন্দর থেকে সোনার চালান নিয়ে বাইরে বের হয়। আর তাদের নিরাপদে বের করতে পলাশ সব ধরনের সহায়তা করে।
অনিক মানি এক্সচেঞ্জের জাকির, ভাই-ভাই মানি এক্সচেঞ্জের টিপু, ঢাকা মানি এক্সচেঞ্জের আলী নেওয়াজ, প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের জাহাঙ্গীর মিয়া এবং জাকির মানি এক্সচেঞ্জের বাকাউল হক ও বাইতুল মিয়ার সঙ্গে পলাশের সম্পর্ক রয়েছে। তার মোবাইল ফোনে এদের সবার মোবাইল নম্বর আছে। তাদের সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ হতো পলাশের।
ভাই ভাই মানি এক্সচেঞ্জের হয়ে গোপনে কাজ করেন খোকন, পঙ্কজ, বাবু, ফরহাদ, উজ্জ্বল, শিব নামের কয়েকজন। আর জাকির মানি একচেঞ্জের হয়ে রাকিব, বিশ্বজিৎ, বিপ্লব কাজ করে।
মামুন, মাসুম, জয়, কালু মিয়া, রাসেল বজলু মিয়া, হক দুলু, কামাল হোসেন, মোবারক পলাশের পরিচিত। তারা সরাসরি বিমানবন্দর থেকে সোনার চালান নিয়ে সংসদ সদস্য লেখা একটি গাড়িতে চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকায় যেতেন। সেখান থেকে তারা সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় লোকদের হাতে সোনার চালান তুলে দিতেন।
সাতক্ষীরা সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশের এপারে আসতেন গওহর, লালু, গোবিন্দ, বিজন হালদার, লক্ষণ, গোপাল, রূপ সাহা। তাদের হাতে সোনার চালান তুলে দিতেন কামাল, দুলু এবং রাসেল। এই রাসেল হচ্ছে পলাশের স্ত্রীর নূরজাহানের ঘনিষ্ঠজন। একসময় রাসেল লাগেজপার্টির সদস্য ছিল। নিরাপদে সোনা গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজ নেয়। পলাশ নিয়মিত দুবাই যেতেন। তার স্ত্রী নূরজাহানের সঙ্গে দুবাইয়ের ইমরান মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী ইমরান আলী ও আসিফ হোসেনের পুরনো বন্ধুত্ব। সেই সূত্র ধরে তারা সেখানে যেতেন। পলাশ স্বীকার করেন সাবেক কাস্টম কর্মকর্তা ওয়াজেদ ও সিভিল এভিয়েশনের রেখা পারভীন. বিমানের কর্মকর্তা শাহজাহান সিরাজ, এমরান আলী, আবদুল মতিন, আনিসুল ইসলামও সোনার চোরাচালানে জড়িত।
পলাশের মোবাইলে পাওয়া গেছে স্ত্রী নূরজাহানের এসএমএস। যেখানে বলা হয়েছে, দুলু জিনিস নিয়ে বের হচ্ছে। তুমি সামলাও। এভাবে বিভিন্ন সময় অসংখ্য এসএমএস রয়েছে পলাশের মোবাইলে। পলাশ ক্যাপ্টেন শামীম নজরুলের মোবাইলেও এসএমএস দিতেন। পাওয়া গেছে এরকম তথ্য স্যার সব খালাস। তারপর অন্য আরও দুজন কর্মকর্তার মোবাইলে এসএমএস গেছে। সেখানে লেখা আছে, সব হাতে নিয়েছি। আসেন ভাগ করে চলে যাব। তবে এসব মেসেজ ভাইবারে প্রদান করত গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত পলাশ।
গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে পলাশ বলেছেন, আইনশৃংখলা বাহিনী, বিভিন্ন সংস্থা ও বিমানের বিভিন্ন পর্যায় ছাড়াও বিমানবন্দরে বিভিন্ন পেশা-শ্রেণীর লোকদের হাতে সপ্তাহে ২ লাখ টাকা পেমেন্ট দেয়া হতো। এর মধ্যে কথিত কিছু নামধারী সংবাদকর্মী প্রতি বৃহস্পতিবার ৫ হাজার টাকা করে নিতেন বলে তিনি গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন।
- সুত্রঃ #যুগান্তর

No comments:
Post a Comment